Friday, November 23, 2007

সময় যখন অসময়

লাবন্য,
অনেকদিন পর লিখতে বসলাম। ভীষণ ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। ঘুম, ক্লাশ, বাসা, পড়া, আবার ঘুম - এই আমার প্রতিদিনকার রুটিন এখন। দম ফেলার সময় নেই। নেটেও বসা হয়না বলতে গেলে। যা-ও বসছি, গুগলে ২-৪ টা সার্চ দিয়ে আবার বেরিয়ে যাই। এরই মাঝে ভীষণ পরিচিত আর ভীষণ বাজে দুটো ঘটনা ঘটল হঠাৎ।ভাবলাম তোমাকে জানাই। তা-ই আজ লিখতে বসা।

ঘটনা ১:
সকাল সাড়ে আটটা। একটু সময় হাতে নিয়েই বের হয়েছি হেঁটে বাস কাউন্টারে যাব বলে। ভার্সিটির বাস। গলির মুখে একটা রিক্সা দাঁড় করানো। ধীরে সুস্থে হাঁটছি। রিক্সার পাশে এসেছি মাত্র, হঠাৎ রিক্সার মুখ ঘুরল আর রিক্সাওয়ালা কিছু একটা বলল মনে হল। প্রথমে বুঝতে পারিনি আমাকেই বলেছে কিনা। জিজ্ঞেস করব কিনা ভেবে আর জিজ্ঞেস করলামনা। মনে হল দরকার হলে সে-ই আবার আমাকে ডেকে বলবে। আরো কিছু দূর যাওয়ার পরে হঠাৎ পাশে দিয়ে তীরবেগে একটা রিক্সা চলে গেল, এবং এবারো মনে হল আমাকেই উদ্দেশ্য করে কিছু বলল যেন। তাকিয়ে দেখি আগের সেই রিক্সাওয়ালাই! এবার আমি নিশ্চিত হলাম সে তখনো আমাকে উদ্দেশ্য করেই কিছু বলেছিল এবং দ্বিতীয়বারো সে একই সাহস দেখাল! দুঃখজনক হলেও সত্য যে এবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং রাগে- দুঃখে অপমানে আমার তখন দিশেহারা অবস্থা। ভয়- এ জন্য যে আবার যদি সামনে গিয়ে একই পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে হয়! নিস্ফল রাগ, আর সীমাহীন অপমান! উফ।

ঘটনা ২:
একই দিনের ঘটনা। জানালার পাশে বসে গল্প করছি। চোখের কোণে হঠাৎ আলো দেখতে পেয়ে বাইরে তাকালাম। পাশের বাড়ীর জানালা। ছেলেটার বয়স কতই বা আর হবে? আমার চেয়ে তো ঢের ছোট। মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলছে। দেখে ফেলেছি বলে লুকিয়ে গেল। একটু পরে আবার আলোর ঝলকানি। আবার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। কি আর করা, হতাশ হয়ে পর্দা টেনে দিলাম।

রাস্তা-ঘাটে, বাসে - টার্মিনালে মেয়েদেরকে হয়রানি করা বা কটু মন্তব্য করা এখন অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কিছু বলার নেই, বা দেখার নেই। আমরা নিজেরা সাহস করে কিছু বলতে পারছিনা কারণ মনে ভয় যদি আরো বেশী অপমানিত হতে হয়! অনেকেই হয়ত বলবেন ছেলেরা তো রাস্তার সব মেয়েকে দেখলেই শীষ বাজায়না, বা অশালীন মন্তব্য করেনা- তাহলে যেই মেয়েকে কটু মন্তব্য শুনতে হচ্ছে তার নিজের দোষেই শুনতে হচ্ছে। মানলাম দু’একজনের ক্ষেত্রে তাদের এ কথা খাটতে পারে, কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে? এসব অসুস্থ মনের ছেলেদের কটু কথার দায়ও যদি আমাদের উপরেই চাপানো হয়, তাহলে এর চেয়ে বেশী দুঃখজনক আর কি হতে পারে? পাড়ার বখাটে থেকে শুরু করে রিক্সাওয়ালা, সবার কাছে আমরা জিম্মি। শুধু এ কারণে যে আমরা দুর্বল। আমাদেরকে কিছু বললে আমরা তেড়ে উঠে মারতে পারিনা, নিজের দুর্বলতা মেনে নিয়ে কিছু না শোনার ভান করে চলে আসি।তোমার পাশে দিয়ে যেতে কেউ তোমাকে কোন খারাপ কথা বলল, আর তুমি ভান করলে তুমি কিছু শোননি, যেন কিছু হয়নি এ ভাব নিয়ে তুমি হেঁটে চলে আসলে - লাবন্য তুমি কি জান নিজেকে কি ভীষণ তুচ্ছ মনে হয় তখন? এ যেন নিজের কাছে নিজের ছোট হয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে মনে হয় সমাজের মুলটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজকাল সবার মাঝে নৈতিকতা, মূল্যবোধ- এ ব্যাপারগুলোর বড্ড অভাব যেন। কেউ মনে হয় এইসব সেকেলে ব্যাপার নিয়ে মাথাও ঘামায়না। নাহয় মাত্র কাল যেই ছেলেকে দেখলাম হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে, আজ সে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখেই শীষ দিচ্ছে! অবশ্য ঢালাওভাবে সবাইকে খারাপ বলাটা হয়ত ঠিক না, তবে ৭০ ভাগ খারাপের জন্য ৩০ ভাগ ভাল মানুষের কথা মনেও আসেনা। যদিও ভাল - খারাপ ব্যপারগুলো বড় বেশি আপেক্ষিক, তবু সেই আপেক্ষিক ভাল কাউকেও আজকাল খুঁজে পাওয়াটা বেশ কষ্টকর!

কোথায় গেলে শান্তি পাব বলতে পার?

No comments: