Sunday, February 14, 2010

এবং একটি অর্থহীন ভালবাসার গল্প

“দুচ্ছাই” বলে চাবিটা এপকেট ওপকেট খুঁজতে খুঁজতেই চোখ পড়ল সাদা রঙ করা কাঠের প্রাচীরের ওপারে। বেশ খানিকটা দূরে, ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তিই হবে হয়ত, সামনে হাতজোড় করে নির্মিলিত নেত্রে ধ্যানরত সে। সাদা শাড়িতে নীল পাড়। শুভ্রতায় আচ্ছন্ন সর্বাঙ্গের বসন। মোহাবিষ্ট হয়ে সামনে এগিয়ে গেল যুবক। শুনশান নিরবতা। অত ভোরে হয়ত ঘুম ভাঙ্গেনি শহরের বেশিরভাগ মানুষের। দু’চারটে সাইকেল টিং টিং ঘন্টা বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল খানেক আগে। অনেক দূরে হঠাৎ হঠাৎ ভোঁ শব্দে গাড়ি চলে যাচ্ছে, আওয়াজ বলতে এটুকুই।

******

খুব ভোরে আজ ঘুম ভেঙ্গেছে এলেনার। প্রতিদিনই ভোরে উঠতে হয় তাদের, কিন্তু আজ আলো ফোঁটার আগেই বিছানা ছেড়েছে সে। ঘুম ভাংতেই কেন যেন আজ খুব বাড়ির কথা মনে পড়ছে হুড়মুড়িয়ে। বাবা-মা, ছোট ভাই পল আর বড় বোন আগাথার জন্য মনটা খুব কেমন করছে তখন থেকেই। অনেকদিন দেখা হয়না। শেষবার যেবার পল এসেছিল নাকের নিচে গোঁফের রেখা দেখা দিচ্ছে কেবল। ভাইটা খুব কেঁদেছিল সেবার। প্রায় দু’বছর হতে চলল এলেনা ব্রত নিচ্ছে। প্রথম প্রথম স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় সব তালগোল পাকিয়ে ফেলত। এখন অনেকটাই থিতু হয়ে এসেছে সব। জন্মাবার আগে থেকেই বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল মেয়ে হলে তাকে ধর্মের পথে, যীশুর পথে উৎসর্গ করবেন। এলেনাকে মানুষ করা হয়েছে একথা মাথায় রেখেই। এলেনাও কখনো আপত্তি জানায়নি। আসলে আপত্তি জানানোর কোন কারনও ছিলনা। ধর্মকে কখনো বোঝা মনে হয়নি তার। প্রতি রোববার বাবার হাত ধরে চার্চে আসার দিনগুলো ছিল এলেনার ভীষন প্রিয়। প্রার্থনাসংগীত আর বাইবেলের পংক্তিগুলো মনের একেবারে ভেতরে গেঁথে নিত সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে আর নিজের ইচ্ছায় আজ সে এখানে। আর মাসকয় পরেই হয়ত সে পুরোদস্তুর সিস্টার এলেনা হয়ে উঠবে।

******

চোখ খুলতেই সামনে অচেনা যুবক।
“শুভ সকাল, কাউকে খুঁজছেন বুঝি?” - মিষ্টি হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল এলেনা।
“না না, এমনিই, এখানে..আসলে..না মানে আমি...”- থতমত খেয়ে হড়বড় করে বলে গেল যুবা।
“জ্বী, আমি এলেনা। আপনি এত সকালে? আজ তো রবিবারও নয়। তাই জানতে চাইলাম কাউকে খুঁজছেন কিনা, হয়ত আপনাকে সাহায্য করতে পারি”= এলেনার সহজ হাসি খানিক স্বস্তি দিল যুবাকে। “না না, এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কি মনে করে যেন....কিছু মনে করবেন না প্লিজ।“
হাঁটতে হাঁটতে এমনি আরও কিছু টুকিটাকি কথায় সদর দরজার গোড়ায় পৌঁছে গেল তারা।
“বিদায়, যীশু আপনার মঙ্গল করুন”- শান্ত সৌম্য দৃষ্টি আর মায়াময় হাসি উপহার দিয়ে চার্চের ডানের আবাসিক হুলের দিকে হেঁটে গেল এলেনা।

যুবার নাম রায়হান।

******

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরটা খুব বেশী বড় নয়। এখানে সবাই প্রায় সবাইকে চেনে। নানার বাড়ীতে তেমন একটা আসা হয়ে ওঠেনা রায়হানের। একবার আসলে আবার যেতেও প্রাণ সায় দেয়না। এবারেও তাই এসেছে বেশ অনেকটা সময় হাতে নিয়ে। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে সে যে কি অদ্ভুত ভাললাগা। নির্জন দুপুরগুলোর বেশীরভাগই কাটে নাম না জানা পাহাড়ি গাছগুলো দেখে, আর কুল কুল করে বয়ে যাওয়া ছোট ছোট ঝর্নাগুলোর পাশে বসে। আসা-যাওয়ার পথেই চার্চটা। বেশ পুরোনো। ছোটবেলায় গিয়েছিল বেশ কয়বার ওখানে। শেষ ক’বার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

“শুভ বিকেল, এদিকেই কোথাও থাকেন বুঝি?” - আগের দিনের মতই শান্তচোখে মিষ্টি হাসি মেখে জিজ্ঞাসা এলেনার।
“না, খুব আশেপাশে না, তবে খুব দুরেও না। আপনার সব চলছে কেমন? খরগোশটা খাচ্ছে তো ঠিকমত? আর গোলাপগূলোর রঙ ফিরেছে?“ - মাফলার ঠিক করতে করতে সামনে এগিয়ে গেল রায়হান।
“জ্বী, আপনার পরামর্শ ভালই কাজে দিয়েছে! পাহাড়ে ঘোরাঘুরি কেমন চলছে আপনার?”
এলেনার নিরাভরন শরীরে শেষ বিকেলের আলো।
নিস্পাপ মুখে শেষ রৌদ্রের ছটা।
মুগ্ধতা রায়হানের।

******

আরো কিছু দিন কাটে।
আরো কিছু ঘন্টা।
পৃথিবীর হিসেবে আরো কিছু সময়।
কিছু কথা জমে, কিছু ভাললাগা ও।
মুগ্ধতা বড্ড বেয়াড়া।
কেবলি বেড়ে চলে।
শনশন।
শনশন।

******

“এ হতে পারে না! আমাকে মাফ করবেন। দয়া করে আর এখানে আসবেন না আপনি।“ - হনহন করে একবারও পিছে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছে এলেনা। রায়হানের পৃথিবীটা ভেঙ্গে যাচ্ছে, গুড়িয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে গড়ে ওঠা রঙ্গিন পৃথিবীটা ক্রমশঃ ধুসর হয়ে যাচ্ছে।
“আমি কিছুই জানতে চাইনা, বুঝতেও চাইনা।“ - যুবকের অস্ফুট চিৎকারে আকাশে-মেঘে মাতম লাগে যেন।

“না হয়না....সংযম, সংযম! যীশু শক্তি দাও আমায়!”
ক্রুশবিদ্ধ যীশু কি টলে উঠলেন?

******

নির্ঘুম রাত।
নিস্তব্ধ চরাচর।
‘বিধান নেই, বিধান নেই!’ , ‘যীশু তোমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনুন!’ , ‘সংসার করার অধিকার নেই তোমার!’
--হায়, মানুষগুলো না হয় বুঝল না যুবতীর মন...স্বর্গের দেবতাদের চোখেও কি একফোঁটা মায়াশ্রু জমেনি যুবতীর আর্তচিৎকারে?

******

“ফাদার, কি করতে পারি আমি? স্বেচ্ছায় এসেছি ব্রত পালন করতে। ভালবেসেছি অজান্তেই। তবে কি আমি মহাপাতকী হলাম? যদি ফিরে যেতে চাই!”
“পার তুমি ফিরে যেতে, তবে ভেবে দেখ সমাজের কথা, পরিবারের কথা।“
অতঃপর ভাবনা...
হায়রে সমাজ।
হায়রে পরিবার....

******

বিদায়কালে সেই একই শান্তচোখের সৌম্যদৃষ্টি এলেনার।
রায়হানের গালে জলের দাগ ছিল তখনো।
রায়হানের চোখে নিষ্ঠুর এলেনা।
জগতের কাছে এলেনা অসহায় ছিল।

******
******
[ টিভিতে দেখা একটি নাটকে উদ্বুদ্ধ হয়ে....]

Friday, February 12, 2010

দু' ইঞ্চি সুখ চাই


আমার ডাইনে দুঃখ, বায়ে দুঃখ
সামনে দুঃখ, পেছনে দুঃখ,
দুঃখ ছাড়া আমার কিছু নাই,
আমি তোমার কাছে দু’ইঞ্চি সুখ চাই...

আমার আকাশে কষ্ট, মাটিতে কষ্ট
সাগরে কষ্ট, পাহাড়ে কষ্ট,
কষ্টে কষ্টে জীবন নষ্ট তাই,
আমি তোমার কাছে দু’ইঞ্চি সুখ চাই...

ইট-কাঠ পাথরের আমার এ শহর
সবকিছু কেড়ে দিয়ে করে দিল পর,
বিষাদের যন্ত্রণায় খাঁ খাঁ করে বুক,
হৃদয়ের পিঠে পড়ে স্মৃতির চাবুক।

ভাগ্যের সাপ লুডু খেলা জঞ্জাল,
কষ্ট ছোবলে আমি বেহুঁশ মাতাল।
বিধাতার খেয়ালি খেলা চলমান,
কারো বুকে বাগিচা, কারো বিরান...
প্রানহীন এ শহরে ভালবাসা নাই,
তাই তোমার কাছে দু’ইঞ্চি সুখ চাই...

......
বেশি কিছু চাইতে বড় ভয় পাই,
তাই তোমার কাছে দু’ইঞ্চি সুখ চাই....


[প্রিতমের এ গানটা উৎসর্গ করলাম আমার সবচেয়ে প্রিয় আর সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে]


http://www.esnips.com/doc/797827cc-3c10-41b6-b05b-25d6dcabb5e1/Solo_Dui_Inch_Sukh_Chai-Pritom_Ahmed___

Wednesday, February 10, 2010

ছন্নছাড়া ভাবনাগুলো - ২


আজকের সকালটা খুব সকালের মতন। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা আবার হালকা একটুখানি মায়া মায়া রোদ্দুর। এর সাথে খুব অল্প একটু জ্বর জ্বর ভাব। ভালই লাগছে। অনেক ছোটবেলার মত একটা অনভুতি হচ্ছে। ওই যে সেই বয়সটা যখন দিন পনের যেতে না যেতেই ঠান্ডা-জ্বর বেধে যেত আমার। তখনও প্রায়-চলে-যাওয়া শীতের সকালগুলোতে এমন একটা ভাললাগা রেশ থাকত যেন। আজ সকাল থেকে মনটাও বেশি খারাপ না। খানিকটা ফুরফুরে মেজাজেই আছি বলা যায়। অবশ্য কতক্ষন এমন কাটবে বলতে পারছিনা। চোখের সামনে ঠিক এই মুহুর্তে দেখতে পাচ্ছি একটা পুচ্চু সেফটিপিন। প্রয়োজনের সময় যেটা কখনই পাইনা এখন তা দিব্বি নাকের সামনে ঝুলছে। আর আছে আমার নকিয়ার ইয়ারফোনটা, যেটা কিনা অর্ধ-নষ্ট, ক্যামেরার ডেটা-ক্যাবল আর আমার অনেক পুরোনো ট্রানসেন্ডের ২৫৬ পেনড্রাইভটা। আহা, যখন কিনেছিলাম ক্লাশে আমারটাই ছিল হাইয়েস্ট ক্যাপাসিটির পেনড্রাইভ। এর আগেরটা ছিল টুইনমসের এমপিথ্রি পেনড্রাইভ। সেও ছিল ক্লাশে প্রথম। কি যত্নেই না রাখতাম। কিন্তু কপাল খারাপ। মাসকয় যেতে না যেতেই নষ্ট হয়ে গেল। ওয়ারেন্টি ছিল বলে রক্ষা। পালটে নিয়ে এসেছিলাম খুব সুন্দর মেয়েলী ছাপের ২৫৬ পেনড্রাইভটা। গেল মাসে আমার এত সাধের ক্যামেরাটাও নষ্ট হয়ে গেল। মাদার বোর্ডে নাকি সমস্যা। সার্ভিস চার্জ ১২০০০ টাকা। ধ্যাত বলে কিনে ফেললাম আরেকটা। কিন্তু আগের ক্যামেরার মায়া এখনো ছাড়তে পারিনি। তাই নতুনটা হাতে নিতে ভাল লাগেনা একদম। মোবাইলটার জীবনিশক্তিও শেষ হবার পথে। বেচারা আমাকে অনেকদিন ধুন্ধুমার সার্ভিস দিয়ে গেছে। আজকাল চার্জ থাকছেনা। কোন এক অদ্ভুত কারনে ব্যাটারীটা ফুলে-ফেঁপে গেছে। দেখি কি করা যায়।

বাইরেটা এখন বেশ মেঘলা হয়ে আছে। আজ মনে হয় সূর্যেরও আলসেমী লাগছে আমার মতন। এক দু’বার চোখদুটো পিটিপিটি করে খুলে আবার মুখ ঢেকে ফেলছে লেপের নিচে। অলস একটা মায়াবী দিন। বইমেলায় যেতে ইচ্ছে করছে। অনেকের মত আমি সারাবছর হয়ত বইমেলার অপেক্ষা করিনা, কিন্তু মেলা শুরু হলে ভালই লাগে। ক্যাম্পাসে কেমন একটা উৎসব উৎসব রব পড়ে যায়। দুইধারের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে যেন মেলা বসে যায়। ফুটপাথে, ডিভাইডারের উপর যেখানে খুশী বসে থাকা যায়। সত্যি বলতে কি মেলার ভেতরের চেয়ে বাইরের এসব টুকিটাকি দেখতেই বেশী ভাল লাগে আমার, আর আনন্দও হয় খুব। গতকাল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে টিপের পাতা নিয়ে মামার সাথে দরদাম করছি যখন ছোট্ট একটা ছেলে চকলেট নিয়ে এসে কি যেন চাইল। অত খেয়াল করিনি, কথা বলতে বলতে আর হাসতে হাসতেই ‘না’ বলে ফেললাম। ছেলেটা কিন্তু একটুও মন খারাপ করলনা, দৌড়ে যেতে যেতে আমাকে বলে গেল ‘কিপটা আপা!’ । শুনে খারাপ তো লাগলই না, কেন যেন উলটা মজা লাগল। ইচ্ছে করল ডেকে নিয়ে এসে কিনে দিই যা চেয়েছিল। কিন্তু চোখের পলকেই উধাও।

কি শুরু করলাম, আর কি বলছি।
তাল নেই কোন।
আরে, বেঁচে থাকাটা খারাপ কিসের ?

Friday, February 5, 2010

জ্বর জ্বর, তিতা তিতা


আবার জ্বর জ্বর। সারা গায়ে ব্যাথা। ঘাড়ে ব্যাথা। মাঝে বেশ অনেকদিন তেমন কোন অসুখ না হওয়াতে ভাবতাম অন্তত জ্বর হলেও ভাল হত। কিছুদিন শুয়ে বসে কাটানো যেত। এখন খুব বিরক্ত লাগছে। ছোটবেলা থেকেই কাশি জিনিসটা খুব অপছন্দ আমার। মাঝে মাঝে দু’একটা হাঁচি দিতে খারাপ লাগেনা। কিন্তু ফুসফুস ফাটানো কাশির দমক অসহ্য লাগে খুব। গায়ে ব্যাথা বলে কাশতেও কষ্ট হচ্ছে। ছোটবেলায় এমন অসুখ হলে সময়টা খারাপ কাটতনা। মা পাশে থাকত অনেকটা সময়। আর রাতে কাশতে কাশতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যেত তখনও দেখতাম মা জেগে আছে পাশে। মাঝরাতে উঠে পানি খেতে চাইতাম খুব - মনে আছে আমার। এখন আর এমন হয়না। একাই থাকা হয় যত অসুখই হোক। মাঝরাতে ঘুম ভাংলে একাই জেগে থাকি। মা-কে জাগাতে মায়া লাগে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর বয়স চলে এসেছে মায়ের। ধ্যাত, বড় বয়সের অসুখে মজা নেই।