“দুচ্ছাই” বলে চাবিটা এপকেট ওপকেট খুঁজতে খুঁজতেই চোখ পড়ল সাদা রঙ করা কাঠের প্রাচীরের ওপারে। বেশ খানিকটা দূরে, ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তিই হবে হয়ত, সামনে হাতজোড় করে নির্মিলিত নেত্রে ধ্যানরত সে। সাদা শাড়িতে নীল পাড়। শুভ্রতায় আচ্ছন্ন সর্বাঙ্গের বসন। মোহাবিষ্ট হয়ে সামনে এগিয়ে গেল যুবক। শুনশান নিরবতা। অত ভোরে হয়ত ঘুম ভাঙ্গেনি শহরের বেশিরভাগ মানুষের। দু’চারটে সাইকেল টিং টিং ঘন্টা বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল খানেক আগে। অনেক দূরে হঠাৎ হঠাৎ ভোঁ শব্দে গাড়ি চলে যাচ্ছে, আওয়াজ বলতে এটুকুই।******
খুব ভোরে আজ ঘুম ভেঙ্গেছে এলেনার। প্রতিদিনই ভোরে উঠতে হয় তাদের, কিন্তু আজ আলো ফোঁটার আগেই বিছানা ছেড়েছে সে। ঘুম ভাংতেই কেন যেন আজ খুব বাড়ির কথা মনে পড়ছে হুড়মুড়িয়ে। বাবা-মা, ছোট ভাই পল আর বড় বোন আগাথার জন্য মনটা খুব কেমন করছে তখন থেকেই। অনেকদিন দেখা হয়না। শেষবার যেবার পল এসেছিল নাকের নিচে গোঁফের রেখা দেখা দিচ্ছে কেবল। ভাইটা খুব কেঁদেছিল সেবার। প্রায় দু’বছর হতে চলল এলেনা ব্রত নিচ্ছে। প্রথম প্রথম স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় সব তালগোল পাকিয়ে ফেলত। এখন অনেকটাই থিতু হয়ে এসেছে সব। জন্মাবার আগে থেকেই বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল মেয়ে হলে তাকে ধর্মের পথে, যীশুর পথে উৎসর্গ করবেন। এলেনাকে মানুষ করা হয়েছে একথা মাথায় রেখেই। এলেনাও কখনো আপত্তি জানায়নি। আসলে আপত্তি জানানোর কোন কারনও ছিলনা। ধর্মকে কখনো বোঝা মনে হয়নি তার। প্রতি রোববার বাবার হাত ধরে চার্চে আসার দিনগুলো ছিল এলেনার ভীষন প্রিয়। প্রার্থনাসংগীত আর বাইবেলের পংক্তিগুলো মনের একেবারে ভেতরে গেঁথে নিত সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে আর নিজের ইচ্ছায় আজ সে এখানে। আর মাসকয় পরেই হয়ত সে পুরোদস্তুর সিস্টার এলেনা হয়ে উঠবে।
******
চোখ খুলতেই সামনে অচেনা যুবক।
“শুভ সকাল, কাউকে খুঁজছেন বুঝি?” - মিষ্টি হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল এলেনা।
“না না, এমনিই, এখানে..আসলে..না মানে আমি...”- থতমত খেয়ে হড়বড় করে বলে গেল যুবা।
“জ্বী, আমি এলেনা। আপনি এত সকালে? আজ তো রবিবারও নয়। তাই জানতে চাইলাম কাউকে খুঁজছেন কিনা, হয়ত আপনাকে সাহায্য করতে পারি”= এলেনার সহজ হাসি খানিক স্বস্তি দিল যুবাকে। “না না, এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কি মনে করে যেন....কিছু মনে করবেন না প্লিজ।“
হাঁটতে হাঁটতে এমনি আরও কিছু টুকিটাকি কথায় সদর দরজার গোড়ায় পৌঁছে গেল তারা।
“বিদায়, যীশু আপনার মঙ্গল করুন”- শান্ত সৌম্য দৃষ্টি আর মায়াময় হাসি উপহার দিয়ে চার্চের ডানের আবাসিক হুলের দিকে হেঁটে গেল এলেনা।
যুবার নাম রায়হান।
******
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরটা খুব বেশী বড় নয়। এখানে সবাই প্রায় সবাইকে চেনে। নানার বাড়ীতে তেমন একটা আসা হয়ে ওঠেনা রায়হানের। একবার আসলে আবার যেতেও প্রাণ সায় দেয়না। এবারেও তাই এসেছে বেশ অনেকটা সময় হাতে নিয়ে। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে সে যে কি অদ্ভুত ভাললাগা। নির্জন দুপুরগুলোর বেশীরভাগই কাটে নাম না জানা পাহাড়ি গাছগুলো দেখে, আর কুল কুল করে বয়ে যাওয়া ছোট ছোট ঝর্নাগুলোর পাশে বসে। আসা-যাওয়ার পথেই চার্চটা। বেশ পুরোনো। ছোটবেলায় গিয়েছিল বেশ কয়বার ওখানে। শেষ ক’বার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
“শুভ বিকেল, এদিকেই কোথাও থাকেন বুঝি?” - আগের দিনের মতই শান্তচোখে মিষ্টি হাসি মেখে জিজ্ঞাসা এলেনার।
“না, খুব আশেপাশে না, তবে খুব দুরেও না। আপনার সব চলছে কেমন? খরগোশটা খাচ্ছে তো ঠিকমত? আর গোলাপগূলোর রঙ ফিরেছে?“ - মাফলার ঠিক করতে করতে সামনে এগিয়ে গেল রায়হান।
“জ্বী, আপনার পরামর্শ ভালই কাজে দিয়েছে! পাহাড়ে ঘোরাঘুরি কেমন চলছে আপনার?”
এলেনার নিরাভরন শরীরে শেষ বিকেলের আলো।
নিস্পাপ মুখে শেষ রৌদ্রের ছটা।
মুগ্ধতা রায়হানের।
******
আরো কিছু দিন কাটে।
আরো কিছু ঘন্টা।
পৃথিবীর হিসেবে আরো কিছু সময়।
কিছু কথা জমে, কিছু ভাললাগা ও।
মুগ্ধতা বড্ড বেয়াড়া।
কেবলি বেড়ে চলে।
শনশন।
শনশন।
******
“এ হতে পারে না! আমাকে মাফ করবেন। দয়া করে আর এখানে আসবেন না আপনি।“ - হনহন করে একবারও পিছে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছে এলেনা। রায়হানের পৃথিবীটা ভেঙ্গে যাচ্ছে, গুড়িয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে গড়ে ওঠা রঙ্গিন পৃথিবীটা ক্রমশঃ ধুসর হয়ে যাচ্ছে।
“আমি কিছুই জানতে চাইনা, বুঝতেও চাইনা।“ - যুবকের অস্ফুট চিৎকারে আকাশে-মেঘে মাতম লাগে যেন।
“না হয়না....সংযম, সংযম! যীশু শক্তি দাও আমায়!”
ক্রুশবিদ্ধ যীশু কি টলে উঠলেন?
******
নির্ঘুম রাত।
নিস্তব্ধ চরাচর।
‘বিধান নেই, বিধান নেই!’ , ‘যীশু তোমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনুন!’ , ‘সংসার করার অধিকার নেই তোমার!’
--হায়, মানুষগুলো না হয় বুঝল না যুবতীর মন...স্বর্গের দেবতাদের চোখেও কি একফোঁটা মায়াশ্রু জমেনি যুবতীর আর্তচিৎকারে?
******
“ফাদার, কি করতে পারি আমি? স্বেচ্ছায় এসেছি ব্রত পালন করতে। ভালবেসেছি অজান্তেই। তবে কি আমি মহাপাতকী হলাম? যদি ফিরে যেতে চাই!”
“পার তুমি ফিরে যেতে, তবে ভেবে দেখ সমাজের কথা, পরিবারের কথা।“
অতঃপর ভাবনা...
হায়রে সমাজ।
হায়রে পরিবার....
******
বিদায়কালে সেই একই শান্তচোখের সৌম্যদৃষ্টি এলেনার।
রায়হানের গালে জলের দাগ ছিল তখনো।
রায়হানের চোখে নিষ্ঠুর এলেনা।
জগতের কাছে এলেনা অসহায় ছিল।
******
******
[ টিভিতে দেখা একটি নাটকে উদ্বুদ্ধ হয়ে....]


