শুরুটা যে কিভাবে করি বুঝতে পারছিনা! মাথায় কিছুই আসছে না। এমনি তো দিব্যি কতই লিখতে পারি। ক্লাশে যখন ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে যেতে চায়, ঘুম তাড়াতে খাতায় কত লাইন আঁকিবুকি করি না? “আজ আকাশ মেঘলা বলে আমার মন ভাল নেই”, “আসার সময় চা খাওয়া হয়নি, ক্লাশ শেষে একবার আলমের দোকানে যাওয়া লাগবে” আর নয়ত পাশের ডেস্কে ছোট চিরকুট- “ স্যারের দিকে অমন হা করে কি দেখছিস?” নয়ত “ স্যারকে কিন্তু নীল রঙ্গে বেশ মানায় “ আরো কত কি! আর রান্নার অনুষ্ঠানগুলোর সময় মা যখন চেঁচিয়ে ডাকে- “ খাতাটা নিয়ে আয় তো! “ দৌড়ে খাতা নিয়ে এসে চটজলদি লিখতে পারি না রেসিপিগুলো ? পারি তো! তবে? শুধু সমস্যা হয়ে যায় এক্সাম পেপারে এন্সারগুলো লেখার সময়, আর যখন কেউ বলে ‘লেখ!’ ঠিক এ সময়গুলোতে মাথা যেন পুরো ফাঁকা হয়ে যায়। এক্সামের সময় তো ঠিক ঠিক লিখতে থাকি যা মনে আসে তা ই, কিন্তু যখনই টিচারগুলো পুরো হল রুম বাদ দিয়ে আমার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ায়, মাথার ভেতরটা তো পুরোপুরি গড়ের মাঠ হয়ে যায় ই, সেই গড়ের মাঠে অদ্ভুত সব চিন্তা এসে হাজির হয়। লেখা থামিয়ে আমি উদাস হয়ে তখন এদিক ওদিক তাকাতে থাকি আর ভাবতে থাকি হলরুমের এতজনকে বাদ দিয়ে ঠিক কোন কারণে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি। হতে পারে আমার চেহারার মধ্যে একটা চোর চোর ভাব আছে, কিন্তু দূর থেকে আমাকে দেখলে কি চলতনা? ঠিক সে সময়ে আমার দেখতে ইচ্ছা করে পাশের টেবিলের জন আজকে কোন জামা পড়ে এসেছে, কয়জন গার্ড দিচ্ছেন আমাদেরকে, নাহয় হঠাৎ ভীষণ হাসি পেতে থাকে কোন তুচ্ছ জিনিস দেখেও। আমার হাবভাব দেখে টিচার ততক্ষনে মোটামুটি শিওর হয়ে যান যে আমার মাথায় কিঞ্চিত সমস্যাআছে, হতাশ হয়ে পাশে থেকে চলে যান- -আমি আবার ভদ্রমানুষ হয়ে ইচ্ছেমত খাতায় আঁকিবুকি করতে শুরু করি। আহা, নিজেকে নিয়ে এত হতাশ হচ্ছি কেন? মনে পড়েছে আমার, ছোটবেলায় আমি লিখতাম তো! মা যখন বলত, “ নানুর কাছে একটা চিঠি লেখ ত দেখি” - আমি আর আমার বোন বসে যেতাম খাতা-পেন্সিল নিয়ে। আমি যখন ঘন্টা আধেকের চেষ্টায় আকাশ পাতাল ভেবে সবে দু’লাইন লিখেছি, “ নানু, আমার সালাম নিবেন। আমরা সবাই ভাল আছি।” আমার বোন আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে চিঠি শেষ করে উঠে যেত। কত মিনতি করতাম, “ আপু, একবার দেখি না। আমি ওরকম লিখবনা তো!” আমার কথা কানে না তুলেই খাতাটা লুকিয়ে চলে যেত। ও চলে গেলে ওর ডেস্ক ঘেঁটে খুঁজে বের করে ফেলতাম চিঠিটা। এরপর আর কি? দশ মিনিটের মাথায় গোটা গোটা অক্ষরে আমার চিঠি লেখাও শেষ হয়ে যেত! আজকাল আর অমন সুন্দর সুন্দর চিঠি লেখা হয়না। চিঠি লেখার কালচার তো উঠেই গেছে। তবে সেদিন খুব অদ্ভুতভাবে একটা চিঠি পেয়েছিলাম! এত ভাল লাগল, বোনটাকে মিস করছিলাম খুব। ও থাকলে তো ওকে দিয়ে একটা উত্তর লিখিয়ে নিতে পারতাম। একদম কিছু না লিখলে খারাপ দেখায় ভেবে শেষমেশ ছোট করে যা লিখলাম তা হল “ তোমার চিঠি পেয়ে আমি খুব খুশী হয়েছি। কিন্তু আমি যে লিখতে পারিনা কিছু!” যাকে লিখেছি সে আমার উত্তর পেয়ে কতটুকু খুশী হয়েছে কে জানে, কিন্তু আমার খুব ফুরফুরে লাগছে যে কারোটা না দেখেও আমি অবশেষে লিখতে পেরেছি! কবে যেন এক লেখকের সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম - “ লেখাটা হচ্ছে প্রসব যন্ত্রণার মত। যখন লিখতে ইচ্ছে হয়, লেখাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যায় না।” তাই ভাবছি জোর করে তো আর প্রসব যন্ত্রণা আনা যায় না! তাই লেখালেখির দুরূহ চেষ্টা এবেলায় না করাই ভাল। অবশ্য পড়তে ভাল লাগে আমার। মোটামুটি সবই পড়ি। মাঝে মাঝে কতক লেখা পড়ে অবাক হয়ে ভাবি, “ আরে, আমিও তো এভাবেই ভেবেছিলাম, তবে আমি কেন অত সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারলাম না?” লেখাটা একটা বিরাট গুণ আসলেই। আমার মত অভাজন কোন সাহসে যে এতক্ষন লিখে যাচ্ছে তাই ভাবছি।
অনেকগুলো লাইন লিখে ফেললাম!
এবার থামা উচিৎ!
Friday, May 16, 2008
বৃষ্টি, আমি ও বাস্তবতা..
যখন লিখছি, বৃষ্টি হচ্ছে। পুরো ঝমঝম বৃষ্টি যাকে বলে! সামনে পরীক্ষা। পি.সি. ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম আশেপাশের সব বাসায় সব জানালা গুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দুদ্দাড় করে। জানালার ধারে আমার পড়ার টেবিলটা ভিজে একসার। হঠাৎ খেয়াল হল বই খাতাগুলো তো ভিজে যাচ্ছে! সরিয়ে নিলাম ওগুলো, তবু জানালা খোলাই রইল। বেশিরভাগ মেয়ের মত আমিও খানিকটা বৃষ্টি বিলাসী। কিন্তু একয়দিন পড়াশুনার চাপে বৃষ্টি দেখা হয়নি সেভাবে। অবশ্য শেষকয়দিন বৃষ্টিটা রাতে পড়েছে বলেই হয়ত শুধু অনুভব করছি, আর শব্দ শুনেছি। আজ হঠাৎ চারদিক কালো করে বৃষ্টি আসল, আর বসে থাকতে পারলামনা। দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম, চেনা বাস্তবতা থেকে খানিকটা দূরে। একটুখানি অবসর। হঠাৎ কি মনে হতে পেছনে ফিরতেই পি.সি-র দিকে চোখ পড়ল। হতাশ হাসি হেসে জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে পড়তে বসলাম।
Friday, February 1, 2008
মেঘের দেশে

স্বপ্নের মতো ১০টা দিন কাটিয়ে এখন আমরা দেশে। মেঘ আর পাহাড়ের দেশে এ কয়দিন ভেসে বেরিয়ে এখন মনে হচ্ছে মর্ত্যের পৃথিবীতে নেমে এসেছি। একটা নাকি লেখা দাঁড় করাতে হবে ট্যুরের আদ্যপান্ত নিয়ে। বিশাল পরিসরের ১০টা দিনকে কোনো মতে চেপেচুপে ২ পৃষ্ঠার লেখায় আটানো- কাজ টা মোটেও সহজ না! কোনটা কোনটা রাখবো আর কোনটাই বা ছেঁটে দিবো কোনো হিসেব পাচ্ছিনা। সম্পাদক সাহেব বলেছেন গোটা ট্যুরের নির্যাসটা যেন পাওয়া যায় লেখাতে, কিন্তু আমি ভাবছি কোপতা-কালিয়া না খেয়ে শুধু গন্ধশুঁকে কি স্বাদ টা পাওয়া যাবে?? যাই হোক, আগেই বলে রাখি এই লেখা শুধু তাদের জন্য যারা ট্যুরে যেতে পারেনি। কারন, এতো সংক্ষেপ লেখা দেখে যারা ট্যুরে ছিল তারা সবাই নিশ্চয়ই খুব হতাশ হবে। কথা কমিয়ে এবার তাহলে শুরু করা যাক। দেশে থাকা বন্ধুরা, এসো তোমাদের গল্প শোনাই, মেঘ আর পাহাড়ের দেশের।
যাত্রা হলো শুরুঃ ২ রা জানুয়ারী ২০০৮। রাত ৮ টায় বাস, পৌঁণে ৮টায় শ্যামলী কাউন্টারে পৌছে দেখি হায় হায় রব। একটা টিকিট নাকি পাওয়া যাচ্ছেনা! টিকিট ছিল মুফতির কাছে। টিকিট হারিয়ে ওর নির্লিপ্ত ঘোষণা,"আমি যাবনা" , আর পেছন থেকে চুপিচুপি ওর লাগেজ বাসে তুলে দেয়া- শুরুটাই ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং। কিছুক্ষন পরে টিকিট খুঁজে পাওয়া, হই হই করে কয়েকজনের বাসে ওঠা, বাকিদের ফেলে রেখে বাসের রওনা হওয়া - শুরুটা আরো থ্রিলিং। আমাদের চিৎকার, সুপারভাইসরের নির্বিকার মুখ, আযমের ঘোষণা "একজনকে বাদ দিয়েও বাস যাবেনা" , ২ বৎসর নটরডেমে পড়ার পরেও জামির পুলিস বক্স না চেনা তাই ওর জন্য টেনশন - শুরুটা জমজমাট! শেষ পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক। ২২টা মাথা গুনে পথচলা শুরু। সীটে আরামে হেলে পরে সবার একটাই কথা - "যাচ্ছি তাহলে, অবশেষে।"
এরপর সারা রাত বাসে হই হুল্লোড়, চেঁচামেঁচি, গান গান খেলা। জাকির ঘোষণা করলো সবার আগে যার গলা ভাঙবে বোঝা যাবে সেই খেলাতে সবচেয়ে আন্তরিক ছিল! বলতে বলতে দেখা গেলো প্রায় সবার গলার অবস্থাই ১২ টা। ভাবছিলাম এখনি যদি গলা ভেঙ্গে যায় তাহলে বাকি ১০ দিন চলবে কি করে? কিন্তু ভেবে কোনলাভ নেই, আবার গান, আবার গলা মেলানো! পথে ফুড ভিলেজে আযম দই খাওয়াল সবাইকে, আর যারা খায়নি তাদের জন্য নিয়ে নেয়া হলো এক হাড়ি। সেই দই আমরা শেষ পর্যন্ত নেপাল গিয়ে খেয়েছি। সেই গল্প নাহয় অন্য কোথাও করবো। অবশেষে সূর্য উঠতে উঠতে আমরা বাংলাদেশ বর্ডারে।
বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা : বর্ডার খুলবে নাকি ৮ টায়। সবাই নাশতা সেরে নিলাম বুড়ির হোটেলে। এরপর আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো, ফটোসেশন। এরি মাঝে হঠাৎ শুনি লিসা কান্না কাটি শুরু করেছে ও আর যেতে পারবেনা। এইটুকু জার্নি তে ওর অবস্থা কাহিল। হায় কপাল! এখন? ও নাকি এখান থেকে আবার ঢাকায় রওনা দিবে। আমরা তো শুনে অবাক। যাই হোক, শেষ মেশ ও আমাদের সাথেই ছিল পুরো ট্যুরে, এবং আর কোন জার্নিতেই ওর তেমন কোন সমস্যা হয়নি। বর্ডার খোলার পরে কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে আসলাম আমরা। নোম্যানস ল্যান্ড দিয়ে আসার সময় কেমন যেন একটা অনুভুতি হচ্ছিল। এইটুকু জায়গা- এটা নাকি কারো না। অদ্ভুত। ইন্ডিয়ান বর্ডারে ঢুকে গেলাম। হঠাৎ শুনি মেহেদিকে আটকে দিয়েছে। ওর নাকি ভিসা তে কি সমস্যা। প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পরে কিছু টাকা দেয়ার পর ছেড়ে দিলো। এখানে একটা মজার ব্যাপারহলো। বুড়িমারী তে একটেল এর নেটওয়ার্ক ছিলনা। কিন্তু চ্যাংড়াবান্ধা এসে দেখি ফুল নেটওয়ার্ক! আমরা তো অবাক। যাই হোক, এরপর বাসে করে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
শিলিগুড়ি টু রানিগঞ্জ : সারা রাত হই হুল্লোড় করে সবাই বেশ ক্লান্তছিলাম। এবার বাসে উঠেই সব ঘুম। এক ঘুমে শিলিগুড়ি। পথে দু-একবার চোখ খুলে বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল বুঝি দেশেই আছি। রাস্তার পাশের সাইন বোর্ডগুলোতে সব বাংলা লেখা। তবে হঠাৎ হঠাৎ দাদা-দিদি শব্দগুলো কানে আসলে বুঝতে পারছিলাম যে ইন্ডিয়াতেচলে এসেছি। শিলিগুড়িতে পৌঁছে আবার সাথে সাথে জিপে করে রওয়ানা দিলাম রানিগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ইন্ডিয়া-নেপাল বর্ডারের ইন্ডিয়ারঅংশটা হচ্ছে রানিগঞ্জ। ওখানে পৌঁছেদুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে রওয়ানা দিলাম নেপাল বর্ডার কাঁকড়ভিটায়।
অবশেষে নেপাল : বিকেলে কাঁকড়ভিটায় পৌঁছে আমরা উঠলাম হোটেল তাজ -এ। আসার আগে শুনেছিলাম নেপালে অনেক ঠান্ডা। কাঁকড়ভিটায় এসে দেখি আমাদের এখানকার চেয়ে ঠান্ডা সামান্য বেশি, খুব বেশি পার্থক্য না। হোটেলের সামনে লনে সন্ধ্যায় সবাই জড়ো হলাম। এরপর গ্রুপ ছবি, কার্ড খেলা। রওয়ানা দেয়ার আগের দিন থেকে তারিকের জ্বর ছিল, রাতে দেখলাম জ্বর কিছুটা কমলেও খুব দুর্বল। পরে ওর রুমে বসে বেশ আড্ডা দিলাম আমরা। বলে রাখি, বগুড়া থেকে বয়ে আনা আযমের বিখ্যাতদই আমরা এখানে খেয়েছি। রাত ১২ টার দিকে জামি হোটেল থেকে এক জগ গরম পানি জোগাড় করল, আর কোত্থেকে যেন কফি। কোন দুধ-চিনি ছাড়াই সবাই মিলে সেই কফি খেলাম। পরদিন নাকি ১৮ ঘণ্টা জার্নি করে কাঠমান্ডু যেতে হবে। রওয়ানা হব রাত ৪ টায়। তাড়াহুড়ো করে সবাই শুয়ে পড়লাম।
কাঁপতে কাঁপতে কাঠমান্ডু : রওয়ানা দিতে দিতে প্রায় ভোর ৫ টা। বাস চলতে শুরু করার পর টের পেলাম ঠান্ডা কাকে বলে! সব জানালা বন্ধ করেও শীতের তোড় কমানো যাচ্ছিলনা। শুধু ভাবছিলাম কখন সকাল হবে, সূর্য উঠবে, তাতে যদি একটু শীত কমে! অবশেষে সকাল। একটা হোটেলে থেমে আমরা নাশতা সেরে নিলাম। আমাদের মেন্যু আগে থেকেই ঠিক করা ছিল- পাউরুটি, সিদ্ধডিম, একটা সন্দেশ, কলা। হোটেলে আশেপাশে সবাইকে যখন দেখলাম ধোঁয়া ওঠা লুচি খাচ্ছে, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। হায় আফসোস। আবার রওয়ানা। যাচ্ছি যাচ্ছি। সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুরে খেলাম একদম ঠান্ডা খিচুড়ি আর দুটো করে ডিম! উপায় নেই, ওগুলো কোনোমতে গিলে আবার রওয়ানা। চলছি চলছি। পথ আর ফুরায় না। এরি মাঝে কেউ কোন সুন্দর কিছু দেখলেই চিৎকার করে ওঠে "বামে বামে!" নইলে " ডানে তাকাও, ডানে!" এই করতে করতে হঠাৎ পথে পড়লো ত্রিফলা নদী। ওহ অসাধারণ। অনেক নিচে টলটলে সবুজ পানি, দুইপাশে বিশাল বিশাল পাথর। মনে হচ্ছিল কোন জনমানুষের পা পড়েনি ওখানে কোন কালে। উপরে পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে মেঘ। কি যে সুন্দর বলে বোঝানো যাবেনা! স্যারকে অনেক বলে কয়ে ৫ মিনিটের জন্য বাস থামানো হলো। চটপট কয়টা ছবি তুলে হুড়মুড় করে আবার বাসে ওঠা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কাঠমান্ডু আর আসেনা! অবশেষে প্রায়১৫ ঘণ্টা জার্নি শেষে রাত সাড়ে ৮টায় কাঠমান্ডু পৌঁছালাম।
বাস থেকে নেমেই দেখি আমাদের সামনে ‘জাভা কফি সপ’ !! হায়রে, ঢাকা থেকে এতো দূরে কাঠমান্ডু এসেও জাভা আমাদেরকে ছাড়লনা। এবার হোটেল পিসাং। সবাই ফ্রেশ হতে হতে রাত প্রায় ১২ টা। ডিনার করতে করতে আরো দেরি। সেই রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা ছিল। ঠান্ডায় সবার জমে যাওয়ার দশা। পরদিন ব্রেকফাস্ট এর পর থেকে আমাদের ঘোরাঘুরি শুরু হবে, তাই হুটোপুটি করে সব্বাই ঘুম! কাঠমান্ডুতেমুলতঃ টেম্পলদেখা হয়। প্রথমে ঘুরতে যাওয়া স্বয়ম্ভুনাথচৈতন্য। প্রথমদিনেই আদনান আর শান্তনুর কেল্লাফতে! টিকিট ছাড়াই ঢুকে গেল! কেন টিকিট কাটলাম- এ আফসোস করতে করতে যখন ভেতরে ঢুকলাম তখন ভাবছি টেম্পল দেখার মাঝে আর আলাদা কি ই বা থাকবে। এদিক সেদিক তাকিয়ে তো আক্কেল গুড়ুম। এত রঙ্গিন, এত সুন্দর! আর উপর থেকে প্রায় পুরো শহরটাকে দেখা যায়। নেপালের মূল আয়ের উৎস ট্যুরিসম। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য শুধু একেকটা টেম্পল ঘিরে চারপাশ এত সুন্দর সাজিয়েছে ওরা, অসাধারন! একটা মজার ব্যাপার ছিল এখানে- হাজার হাজার বাঁদর! পুরো নেপালে আর কোথাও কোন বাঁদর দেখিনি আমরা, শুধু এই টেম্পলটাতেই! হাজারে হাজারে নিজের পূর্বপুরূষদেরকে দেখে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। পটাপট কিছু ছবি তুলে ছলছল নয়নে ওদের সেখানে রেখেই আমরা রওয়ানা দিলাম বোধনাথ স্তুপা। বোধনাথ স্তুপাও খুব ঝলমলে। পুরো জায়গাটা ঘিরে রঙ্গিন রঙ্গিন সব দোকান। তবে ট্যুরিস্ট স্পট বলে সবকিছুর দাম ও বেশি। ওখান থেকে আবার হোটেল। দুপুরে খাওয়ার পর ভক্তপুর যাওয়ার কথা দরবার স্কয়ার দেখার জন্য। আমাদেরকে বলা হলো খুব তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিতে হবে, কারণ ভক্তপুরহয়ে আমরা নাগরকোটে যাব সূর্যাস্ত দেখতে। রওয়ানা দেয়ার সময় ও কত ঘটনা! তারিক, জেরীন গেলো ফোন করতে। ওদেরকে আনতে গেলো ওয়ালি। ওরা কেউ আসছেনা বলে সাইদ, আলভি রওয়ানা দিলো ওদেরকে খুঁজতে। ওদেরকেও পাওয়া যাচ্ছেনা বলে মুফতি,আযম বেরিয়ে পরলো। খোঁজ খোঁজ। অবশেষে আমাদের লোকাল এজেন্ট রাজু ভাই ওদেরকে খুঁজে পেলো। অচেনা জায়গা। বাস ছিল অন্য জায়গায়। ঘুরতে ঘুরতে পথ হারিয়ে ফেলেছিল ওরা। এবার ভক্তপুর।
যাত্রা হলো শুরুঃ ২ রা জানুয়ারী ২০০৮। রাত ৮ টায় বাস, পৌঁণে ৮টায় শ্যামলী কাউন্টারে পৌছে দেখি হায় হায় রব। একটা টিকিট নাকি পাওয়া যাচ্ছেনা! টিকিট ছিল মুফতির কাছে। টিকিট হারিয়ে ওর নির্লিপ্ত ঘোষণা,"আমি যাবনা" , আর পেছন থেকে চুপিচুপি ওর লাগেজ বাসে তুলে দেয়া- শুরুটাই ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং। কিছুক্ষন পরে টিকিট খুঁজে পাওয়া, হই হই করে কয়েকজনের বাসে ওঠা, বাকিদের ফেলে রেখে বাসের রওনা হওয়া - শুরুটা আরো থ্রিলিং। আমাদের চিৎকার, সুপারভাইসরের নির্বিকার মুখ, আযমের ঘোষণা "একজনকে বাদ দিয়েও বাস যাবেনা" , ২ বৎসর নটরডেমে পড়ার পরেও জামির পুলিস বক্স না চেনা তাই ওর জন্য টেনশন - শুরুটা জমজমাট! শেষ পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক। ২২টা মাথা গুনে পথচলা শুরু। সীটে আরামে হেলে পরে সবার একটাই কথা - "যাচ্ছি তাহলে, অবশেষে।"
এরপর সারা রাত বাসে হই হুল্লোড়, চেঁচামেঁচি, গান গান খেলা। জাকির ঘোষণা করলো সবার আগে যার গলা ভাঙবে বোঝা যাবে সেই খেলাতে সবচেয়ে আন্তরিক ছিল! বলতে বলতে দেখা গেলো প্রায় সবার গলার অবস্থাই ১২ টা। ভাবছিলাম এখনি যদি গলা ভেঙ্গে যায় তাহলে বাকি ১০ দিন চলবে কি করে? কিন্তু ভেবে কোনলাভ নেই, আবার গান, আবার গলা মেলানো! পথে ফুড ভিলেজে আযম দই খাওয়াল সবাইকে, আর যারা খায়নি তাদের জন্য নিয়ে নেয়া হলো এক হাড়ি। সেই দই আমরা শেষ পর্যন্ত নেপাল গিয়ে খেয়েছি। সেই গল্প নাহয় অন্য কোথাও করবো। অবশেষে সূর্য উঠতে উঠতে আমরা বাংলাদেশ বর্ডারে।
বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা : বর্ডার খুলবে নাকি ৮ টায়। সবাই নাশতা সেরে নিলাম বুড়ির হোটেলে। এরপর আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো, ফটোসেশন। এরি মাঝে হঠাৎ শুনি লিসা কান্না কাটি শুরু করেছে ও আর যেতে পারবেনা। এইটুকু জার্নি তে ওর অবস্থা কাহিল। হায় কপাল! এখন? ও নাকি এখান থেকে আবার ঢাকায় রওনা দিবে। আমরা তো শুনে অবাক। যাই হোক, শেষ মেশ ও আমাদের সাথেই ছিল পুরো ট্যুরে, এবং আর কোন জার্নিতেই ওর তেমন কোন সমস্যা হয়নি। বর্ডার খোলার পরে কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে আসলাম আমরা। নোম্যানস ল্যান্ড দিয়ে আসার সময় কেমন যেন একটা অনুভুতি হচ্ছিল। এইটুকু জায়গা- এটা নাকি কারো না। অদ্ভুত। ইন্ডিয়ান বর্ডারে ঢুকে গেলাম। হঠাৎ শুনি মেহেদিকে আটকে দিয়েছে। ওর নাকি ভিসা তে কি সমস্যা। প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পরে কিছু টাকা দেয়ার পর ছেড়ে দিলো। এখানে একটা মজার ব্যাপারহলো। বুড়িমারী তে একটেল এর নেটওয়ার্ক ছিলনা। কিন্তু চ্যাংড়াবান্ধা এসে দেখি ফুল নেটওয়ার্ক! আমরা তো অবাক। যাই হোক, এরপর বাসে করে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
শিলিগুড়ি টু রানিগঞ্জ : সারা রাত হই হুল্লোড় করে সবাই বেশ ক্লান্তছিলাম। এবার বাসে উঠেই সব ঘুম। এক ঘুমে শিলিগুড়ি। পথে দু-একবার চোখ খুলে বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল বুঝি দেশেই আছি। রাস্তার পাশের সাইন বোর্ডগুলোতে সব বাংলা লেখা। তবে হঠাৎ হঠাৎ দাদা-দিদি শব্দগুলো কানে আসলে বুঝতে পারছিলাম যে ইন্ডিয়াতেচলে এসেছি। শিলিগুড়িতে পৌঁছে আবার সাথে সাথে জিপে করে রওয়ানা দিলাম রানিগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ইন্ডিয়া-নেপাল বর্ডারের ইন্ডিয়ারঅংশটা হচ্ছে রানিগঞ্জ। ওখানে পৌঁছেদুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে রওয়ানা দিলাম নেপাল বর্ডার কাঁকড়ভিটায়।
অবশেষে নেপাল : বিকেলে কাঁকড়ভিটায় পৌঁছে আমরা উঠলাম হোটেল তাজ -এ। আসার আগে শুনেছিলাম নেপালে অনেক ঠান্ডা। কাঁকড়ভিটায় এসে দেখি আমাদের এখানকার চেয়ে ঠান্ডা সামান্য বেশি, খুব বেশি পার্থক্য না। হোটেলের সামনে লনে সন্ধ্যায় সবাই জড়ো হলাম। এরপর গ্রুপ ছবি, কার্ড খেলা। রওয়ানা দেয়ার আগের দিন থেকে তারিকের জ্বর ছিল, রাতে দেখলাম জ্বর কিছুটা কমলেও খুব দুর্বল। পরে ওর রুমে বসে বেশ আড্ডা দিলাম আমরা। বলে রাখি, বগুড়া থেকে বয়ে আনা আযমের বিখ্যাতদই আমরা এখানে খেয়েছি। রাত ১২ টার দিকে জামি হোটেল থেকে এক জগ গরম পানি জোগাড় করল, আর কোত্থেকে যেন কফি। কোন দুধ-চিনি ছাড়াই সবাই মিলে সেই কফি খেলাম। পরদিন নাকি ১৮ ঘণ্টা জার্নি করে কাঠমান্ডু যেতে হবে। রওয়ানা হব রাত ৪ টায়। তাড়াহুড়ো করে সবাই শুয়ে পড়লাম।
কাঁপতে কাঁপতে কাঠমান্ডু : রওয়ানা দিতে দিতে প্রায় ভোর ৫ টা। বাস চলতে শুরু করার পর টের পেলাম ঠান্ডা কাকে বলে! সব জানালা বন্ধ করেও শীতের তোড় কমানো যাচ্ছিলনা। শুধু ভাবছিলাম কখন সকাল হবে, সূর্য উঠবে, তাতে যদি একটু শীত কমে! অবশেষে সকাল। একটা হোটেলে থেমে আমরা নাশতা সেরে নিলাম। আমাদের মেন্যু আগে থেকেই ঠিক করা ছিল- পাউরুটি, সিদ্ধডিম, একটা সন্দেশ, কলা। হোটেলে আশেপাশে সবাইকে যখন দেখলাম ধোঁয়া ওঠা লুচি খাচ্ছে, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। হায় আফসোস। আবার রওয়ানা। যাচ্ছি যাচ্ছি। সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুরে খেলাম একদম ঠান্ডা খিচুড়ি আর দুটো করে ডিম! উপায় নেই, ওগুলো কোনোমতে গিলে আবার রওয়ানা। চলছি চলছি। পথ আর ফুরায় না। এরি মাঝে কেউ কোন সুন্দর কিছু দেখলেই চিৎকার করে ওঠে "বামে বামে!" নইলে " ডানে তাকাও, ডানে!" এই করতে করতে হঠাৎ পথে পড়লো ত্রিফলা নদী। ওহ অসাধারণ। অনেক নিচে টলটলে সবুজ পানি, দুইপাশে বিশাল বিশাল পাথর। মনে হচ্ছিল কোন জনমানুষের পা পড়েনি ওখানে কোন কালে। উপরে পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে মেঘ। কি যে সুন্দর বলে বোঝানো যাবেনা! স্যারকে অনেক বলে কয়ে ৫ মিনিটের জন্য বাস থামানো হলো। চটপট কয়টা ছবি তুলে হুড়মুড় করে আবার বাসে ওঠা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কাঠমান্ডু আর আসেনা! অবশেষে প্রায়১৫ ঘণ্টা জার্নি শেষে রাত সাড়ে ৮টায় কাঠমান্ডু পৌঁছালাম।
বাস থেকে নেমেই দেখি আমাদের সামনে ‘জাভা কফি সপ’ !! হায়রে, ঢাকা থেকে এতো দূরে কাঠমান্ডু এসেও জাভা আমাদেরকে ছাড়লনা। এবার হোটেল পিসাং। সবাই ফ্রেশ হতে হতে রাত প্রায় ১২ টা। ডিনার করতে করতে আরো দেরি। সেই রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা ছিল। ঠান্ডায় সবার জমে যাওয়ার দশা। পরদিন ব্রেকফাস্ট এর পর থেকে আমাদের ঘোরাঘুরি শুরু হবে, তাই হুটোপুটি করে সব্বাই ঘুম! কাঠমান্ডুতেমুলতঃ টেম্পলদেখা হয়। প্রথমে ঘুরতে যাওয়া স্বয়ম্ভুনাথচৈতন্য। প্রথমদিনেই আদনান আর শান্তনুর কেল্লাফতে! টিকিট ছাড়াই ঢুকে গেল! কেন টিকিট কাটলাম- এ আফসোস করতে করতে যখন ভেতরে ঢুকলাম তখন ভাবছি টেম্পল দেখার মাঝে আর আলাদা কি ই বা থাকবে। এদিক সেদিক তাকিয়ে তো আক্কেল গুড়ুম। এত রঙ্গিন, এত সুন্দর! আর উপর থেকে প্রায় পুরো শহরটাকে দেখা যায়। নেপালের মূল আয়ের উৎস ট্যুরিসম। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য শুধু একেকটা টেম্পল ঘিরে চারপাশ এত সুন্দর সাজিয়েছে ওরা, অসাধারন! একটা মজার ব্যাপার ছিল এখানে- হাজার হাজার বাঁদর! পুরো নেপালে আর কোথাও কোন বাঁদর দেখিনি আমরা, শুধু এই টেম্পলটাতেই! হাজারে হাজারে নিজের পূর্বপুরূষদেরকে দেখে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। পটাপট কিছু ছবি তুলে ছলছল নয়নে ওদের সেখানে রেখেই আমরা রওয়ানা দিলাম বোধনাথ স্তুপা। বোধনাথ স্তুপাও খুব ঝলমলে। পুরো জায়গাটা ঘিরে রঙ্গিন রঙ্গিন সব দোকান। তবে ট্যুরিস্ট স্পট বলে সবকিছুর দাম ও বেশি। ওখান থেকে আবার হোটেল। দুপুরে খাওয়ার পর ভক্তপুর যাওয়ার কথা দরবার স্কয়ার দেখার জন্য। আমাদেরকে বলা হলো খুব তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিতে হবে, কারণ ভক্তপুরহয়ে আমরা নাগরকোটে যাব সূর্যাস্ত দেখতে। রওয়ানা দেয়ার সময় ও কত ঘটনা! তারিক, জেরীন গেলো ফোন করতে। ওদেরকে আনতে গেলো ওয়ালি। ওরা কেউ আসছেনা বলে সাইদ, আলভি রওয়ানা দিলো ওদেরকে খুঁজতে। ওদেরকেও পাওয়া যাচ্ছেনা বলে মুফতি,আযম বেরিয়ে পরলো। খোঁজ খোঁজ। অবশেষে আমাদের লোকাল এজেন্ট রাজু ভাই ওদেরকে খুঁজে পেলো। অচেনা জায়গা। বাস ছিল অন্য জায়গায়। ঘুরতে ঘুরতে পথ হারিয়ে ফেলেছিল ওরা। এবার ভক্তপুর।

ভক্তপুর চৌদ্দ- আঠারো শতাব্দী পর্যন্ত মল্ল রাজাদের সমৃদ্ধশালী নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। এমনিতেই আমাদের হাতে সময় নেই, তার উপর যখন টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি নেপালী রুপী ছাড়া ইন্ডিয়ান রুপী চলে না, তখন মেজাজ সপ্তমের এক স্তর উপরে চড়ল। কারণ, প্রায় কারো কাছেই এত নেপালী রুপী ছিলনা। শেষে এর থেকে ১০০ থেকে ৫০০ এভাবে ভিক্ষে করতে করতে সবার টিকিট কাটা হল আর মাঝে দিয়ে ফারহান স্যারের উসিলায় তারিক ফ্রিতে ঢুকে গেল ভক্তপুর! গজগজ করতে করতে ভেতরে গিয়ে শুনি আদনান- শান্তনু এবারো হিরো! এবারো টিকিট ছাড়া চেকারের পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে ওরা! যাই হোক, নাকে মুখে ভাত গেলার মত করে আমরা পাঠান দরবার দেখলাম। এরপরও ফারহান স্যার আর জাবের স্যারের হুমকি ধামকি শুনতে শুনতে রুদ্ধশ্বাসে ছুটলাম নাগরকোটের দিকে।
এ যেন এক প্রতিযোগিতা প্রকৃতির সাথে আমাদের। সবার মাঝে টানটান উত্তেজনা- পশ্চিমাকাশ লাল হয়ে আসছে। সূর্য্যিমামা ডুবি ডুবি
করছে, আর আমরা বাসের সবাই জপ করে যাচ্ছি- আর একটু থেমে থাক মামা, আর একটু! আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে বাস শুধু উপরে উঠছেই। নিচে তাকালে পাহাড়িদের টুকিটাকি ঘর বাড়ি দেখা যায়। পাহাড় কেটে জুম চাষ করে ওরা। সেও একটা আর্ট! অনেক উপর থেকে নিচে তাকাতে খুব ভালো লাগছিল। আকাশটা খুব সুন্দর লাগছিল অনেক আগে থেকেই। শেষমেশ যখন উপরে পৌঁছালাম, বাস থেকে নেমে সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম। আকাশে যেন আগুন লেগেছে! এত সুন্দর, এত সুন্দর! সূর্য নেই, কিন্তু যেই আভা রেখে গেছে- বর্ণনা করা যায়না। খুব আফসোস হলো কেন ২০ মিনিট আগে পৌঁছাতে পারলামনা। হিমালয়ের ধবলগিরি রেঞ্জটা দেখা যায় এখান থেকে। শেষ সূর্যের আলোয় সাদা ধবলগিরি যেন লাল হয়ে গিয়েছিল! সাথেই লাগোয়া একটা দোকান ছিল। চমৎকার সব স্যূভেনিরপাওয়া যায়, কিন্তু যেই দাম! পাশের রেস্টুরেন্টে ঢোকার টাকা নেই বলে রেস্টুরেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলেই খাওয়ার সাধ পূর্ণ করলাম। এরপর স্যারদের চিৎকার চেঁচামেচিতে নেমে পড়তে হলো। আবার হোটেলের উদ্দেশ্যে যাত্রা, বাসে গলা ফাটিয়ে গান। সেই রাতে আমাদের কোনো কাজ নেই। হোটেলের আশেপাশে শুধু ঘুরে দেখা।রাতের কাঠমান্ডু আসলেই মজার। সন্ধ্যা ৭ টা বাজতেই ওদের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যায়। বার-ক্লাবগুলো খুলে যায় সে সময়। আর ওখানে ধুন্ধুমার বাজনা। দোকানের পাশে দিয়ে হাঁটার সময় আপসেই একটা রিদম চলে আসে। সবাই ছোট ছোটদলে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পরলাম। নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়ানো, ওয়াই-ওয়াই খাওয়া, মো-মো খোঁজা এই করতে করতে স্যারদের সাথে দেখা। ফারহান স্যার আমাদেরকে একটা দোকানের কথা বললেন যেখানে ভালো পেস্ট্রি পাওয়া যাচ্ছে। সাথে সাথে হই হই করে স্যারকে নিয়ে সেই দোকানে গেলাম। স্যার হয়তো পরে আফসোস করেছিলেন আমাদেরকে দোকানের সন্ধান দিয়ে, কারণ, আমাদের খাওয়ার সব বিল স্যারকে দিতে হয়েছিল! এরপর হোটেলে ফিরে ডিনারের পর শুরু হলো আমাদের জলসা। আমাদের ছেলেরা যে এত দারুন নাচে আমাদের জানা ছিলনা! আযমের নাটক, নাঈমের দাপাদাপি, মুফতি-বান্নার হিপ হপ, ওয়ালির উদ্বাহু ঝাকানাকা নৃত্য - এক কথায় অসাধারণ। আমাদের গোটা ট্যুরের সেরা জলসা ছিল এটাই। ইচ্ছেমতো লাফালাফি করে ক্লান্ত হয়ে সবাই ঘুমিয়ে পরলাম। পরদিন ব্রেকফাস্ট -এর পরে পোখরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম আমরা।
পোখরা যাওয়ার পথেঃ যাওয়ার পথে স্যারদেরকেঅনেক বলে কয়ে চাইনিজ মার্কেটে বাস থামালাম । এখানে নাকি সবকিছু খুব সস্তায় পাওয়া যায় । দেখলাম কথা সত্য । এখান থেকে প্রায় সবাই জুতো, জ্যাকেট টাইপ কিছু না কিছু কেনাকাটা করলাম । হঠাৎ এক জায়গায় দেখা গেল জাবের স্যার দাঁড়িয়ে কাগজে কি যেন করছেন । উঁকি দিয়ে জানা গেল উনি সেখানে দাঁড়িয়েই খচ্খচ্ করে স্কেচ করে চলেছেন । স্যার খুব ভাল আঁকেন। মূলত এই মার্কেটে নামা হয়েছিল একটা এম্প্লিফায়ার সহ সাউন্ড বক্স খোঁজার জন্য । আগের রাতের জলসাতে আমরা একটা সাউন্ড বক্স খুব মিস করেছিলাম । যাই হোক, সাউন্ড বক্স ছাড়া বাকি সবই কিনে আবার বাস ।
পোখরা যাবার পথে আবার ত্রিফলা নদীর একটা শাখা চোখে পড়ল । স্যারদেরকে আবার বলে কয়ে বাস থামানো হল । খুব আফসোস হল যে আমরা বোট র্যাফ্টিং করতে পারছিনা। আবার কিছু ছবিটবি তুলে রওয়ানা দিলাম । যাওয়ার পথে মনোকামনা তে ক্যাবল কার চড়ার কথা আমাদের। এ অভিজ্ঞতাটা চমৎকার । দুপাশে দুই পাহাড়ের মাঝে রোপ-ওয়ে করে দেয়া, শূণ্যে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছি আমরা । নিচে সারে সারে কমলা গাছ, ত্রিফলা নদীর প্রায় পুরোটাই দেখা যায় উপর থেকে । আর এত উপর থেকে নিচে পাহাড়ের গায়ে গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল যেন খেলনা ! প্রায় ২০ মিনিটের যাত্রা শেষে আমরা ওপারে পৌঁছলাম । ওখানে বেশ কিছু দোকানপাট আছে । যে যার মত কেনাকাটা করে আবার ফিরতি পথ ধরলাম ।
পোখরাঃ পোখরা এসে সবাই দারুণ খুশি কারণ আমাদের হোটেলটা খুব সুন্দর ছিল । সাথে লাগোয়া বারান্দা । বারান্দায় দাঁড়ালে মাথার উপরে তারা ভরা বিশাল আকাশ । আমরা আসতে আসতেই আশেপাশের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । পরদিন সানরাইজ দেখতে রওয়ানা দেওয়ার কথা ভোর ৪টায়। তাই রাতে আর না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম গল্প করে ।
আমরা সবাই সাড়ে তিনটার মধ্যে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার মোড়ে বাসের অপেক্ষায় । বাস আর আসে না । একসময় যখন মোটামুটি তৈরি হয়ে গেলাম রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়েই সানরাইজ দেখব বলে, তখন হঠাৎ বাসের হর্ণ । এক লাফে বাসে । নিমিষেই সারেংকোট । সারেংকোট পৌঁছে বাস থেকে নেমে কিছু দূর রাস্তা হেঁটে উপরে উঠতে হবে । রাস্তা অন্ধকার । আকাশে লক্ষতারার মেলা, আর পাহাড়ের খাদের প্রতিটা বাড়ি যেন এক বিন্দু আগুন । মনে হচ্ছিল উপরে – নিচে দুদিকেই যেন তারার হাট বসেছে । সে এক অপূর্ব দৃশ্য। একদম উপরে উঠে দেখি একটা চা এর দোকান । ওখানে চা খাওয়ার পর জাবের স্যার আমাদেরকে তারা চেনাতে বসলেন । ধ্রুবতারা আর সন্ধ্যাতারা নিয়ে স্যারের সাথে তর্কাতর্কি করতে করতেই শুনি উপর থেকে ডাক দিচ্ছে সবাইকে । দৌড়ে সবাই উপরে গেলাম । একটু একটু করে আকাশ লাল হয়ে আসছে । সারেংকোটের এ দিকটাতে দেখা যায় হিমালয়ের অন্নপুর্ণা রেঞ্জ । সূর্যের প্রথম আলো যখন পাহাড়ের গায়ে এসে পড়ছিল তখন পাহাড়ের চূড়াগুলো আস্তে আস্তে লাল হতে শুরু করল। আরেকটু পরে গোটা পাহাড়ে যেন আগুন লেগে গেল । পুরো সোনালি ! সে এক অসাধারণ দৃশ্য ! এদিকে সূর্য তখনো দেখা যাচ্ছে না। একটু পরে বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ দেখি মামা হাজির । সূর্য্যিমামা । একটু একটু করে উপরের দিকে উঠছে পুরো বোঝা যাচ্ছে! ২ মিনিটের মাথায় পুরো মুখদর্শন । খুব সুন্দর ।
ব্রেকফাস্টের আগেই আমাদের ব্যাট কেইভ আর মাহেন্দ্রা কেইভ দেখতে যাওয়ার কথা । ব্যাট কেইভ এ নামতে গিয়ে অন্ধকারে বেশ সমস্যা হলেও বেশ এড্ভেঞ্চার হয়েছে । যদিও স্যাররা গজ্গজ্ করছিলেন, “বাদুর দেখতে এত কষ্ট করার কি আছে??”..এই..সেই..তবু আমার বিশ্বাস উনারাও বেশ আনন্দ পাচ্ছিলেন । বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ বলা হল উপরে তাকাতে । তাকিয়ে দেখি হাজার হাজার বাদুর উপরে গুহার গায়ে ঝুলে আছে । সাথে সাথে ফারহান স্যারের ঘোষনা, “ আর যাওয়ার দরকার নেই, এখান থেকেই ফিরে চল” । যদিও কেউ কেউ চাইছিলাম ফেরার পথে শেষজন একটা ঢিল ছুড়ে দৌড়ে চলে আসবে, কিন্তু আইডিয়াটা কেন যেন সবার মনঃপুত হল না । যাই হোক, এরপর মাহেন্দ্রা কেইভ । চিনামাটির একটা গুহা । ব্যাট কেইভ দেখে আসার পরে এই গুহাটাকে খুব আহামরি কিছু মনে হয়নি । এবার হোটেল
। নাস্তার পর একটু রেস্ট নিয়ে বের হলাম শপিং এ। খুবই ফালতু টাইপ একটা মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হল আমাদেরকে, যেখানে গিয়ে আমাদের মনে হল এর চেয়ে আমাদের হোটেলের আশপাশের লেক সাইড দোকানগুলোতে অনেক বেশি জিনিশ পাওয়া যায় । তবু ওখান থেকে টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করে সময় কাটালাম আমরা । আর অনেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্নপূর্ণার পাহাড় আর তার সাথে মেঘের অপরূপ খেলা উপভোগ করতে মেতেছিল । বিকেলে যাওয়ার কথা ফেওয়া লেকে । আমাদের হোটেলের পাশেই ফেওয়া লেক । সবাই আমরা এত্ত বেশি ক্লান্ত ছিলাম যে সাড়ে তিনটায় ফেওয়া লেকে যাওয়ার কথা তা গড়ালো পাঁচটায় । ঘুম থেকে উঠে দৌড় দিলাম লেকের দিকে । শেষ বিকেলের শেষ আলো স্পর্শ করেছে লেকের স্বচ্ছ পানিতে । অন্নপূর্ণা র ছায়া এসে পড়েছে ফেওয়ার স্বচ্ছ বুকে । সেকি এক দৃশ্য । যাই হোক, নৌকায় করে আমরা গেলাম লেকের বুকে দ্বীপের মত এক মন্দিরে । সেখানে ফটো সেশন শেষ করে যখন ঘড়ি দেখলাম, দেখি এক ঘন্টা হতে চলল । এক ঘন্টার জন্য আমাদের নৌকা ভাড়া করা হয়েছে তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবার চড়লাম নৌকায় । এইবার শুরু হল নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা । আমাদের আর জামিদের নৌকার মাঝে । জামিরা যেই এগিয়ে যায় যায় করছে এমন সময় কান্ডারী হয়ে নতুন ভূমিকায় আবির্ভূত হল আমাদের জেরীন । তুমুল প্রতিযোগিতা আর টান টান উত্তেজনার মাঝে আমরা জয়ী হলাম ।সন্ধ্যার পর বের হলাম আমাদের হোটেলের আশেপাশের দোকানগুলোতে কেনাকাটা করতে । মজা লাগল জাকির কে দেখে । ও নিজের হবু সংসারের জন্য বিছানার চাদর থেকে শুরু করে কুশন কভার পর্যন্ত সব কিনে ফেলেছে ! শুধু ফার্নিশার্স কেনা বাকি ছিল ওর । দেশে ফেরার পর বাণিজ্য মেলায় গিয়ে আমরা ওকে ফার্নিশার্স ও কিনে ফেলাম বুদ্ধি দিলাম, কিন্তু ট্যুর শেষে টাকার অভাবে ও আর কিছু কিনতে পারে নি তখন । যাই হোক, ট্যুরের কথায় ফিরে আসি । সন্ধ্যা থেকে প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত আমরা সবাই ঘোরাঘুরি করলাম । কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া । হোটেলে ফিরে ডিনার সেরে আবার বের হলাম চা খুঁজতে । সব দোকান বন্ধ । চারদিক শুনশান । একটা দোকান পেলাম । সেখানে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে গোল হয়ে বসে সবাই চা খেলাম । এও এক দারুণ স্মৃতি । পরদিন আমরা পোখরা ছেড়ে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব, এরি মাঝে একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটল । তারিক – যে কিনা আমাদের ট্যুরের জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল ও প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ল । সিদ্ধান্ত নেওয়া হল তারেক জাবের স্যারের সাথে পরদিন ঢাকার দিকে ফ্লাই করবে । এখানে বলে রাখি তারিক, তোকে ফেলে দার্জিলিং যেতে হবে ভেবে আমাদের মন ভীষণ খারাপ ছিল রে । আর বাকি ট্যুরে আমরা তোকে অনেক মিস করেছি । বিশেষ করে ফেরার দিন বাসে যখন সবাই ঝিমুচ্ছিল তখন মনে হয়েছে তুই থাকলে নিশ্চয়ই হইচই করে সবাইকে চাঙ্গা করে দিতি । সে রাতে তারিকের জন্য আরেক জলসা বসল । এই জলসার হিরো তমাল আর বান্না ।
তারেক, জাবের স্যার ও অথৈ ম্যামের থেকে বিদায় নিয়ে পরদিন ভোর ৬টার দিকে আমরা রওয়ানা হলাম দার্জিলিং এর উদ্দেশ্য ।
আবার কাঁকড়ভিটা : প্রায় ১২টা ঘন্টা জার্নি শেষে আবার আমরা ফিরে এলাম কাঁকড়ভিটায় তাজ হোটেলে । সে রাতে আমাদের বারবিকিউ করার ছিল, সাথে ক্যাম্প ফায়ারিং । মসলাপাতির অভাবে বারবিকিউ করা না হলেও ক্যাম্প ফায়ারিং হল । আগুন জ্বেলে তার চারপাশে নাচা-গাওয়া । অনেক রাত পর্যন্ত । পরদিন নেপাল ছেড়ে চলে যাব ভেবে খারাপই লাগছিল । ট্যুর শেষের ঘন্টা যেন বাজতে শুরু করেছিল তখন থেকেই । পরদিন সকালে ফেরার জন্য সবাই যখন প্রায় রেডি হঠাৎ মুফতি আর জাকিরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা । শেষ মুহূর্তে জানা গেল ওরা রুমেই আছে , ঘুমাচ্ছে - ওদেরকে জাগানো হয়নি । তারপর আর কি? তাড়াহুড়ো করে সব গুছিয়ে আবার বর্ডার ।
৭০০০ ফিট উপরেঃ শিলিগুড়ি থেকে জিপে করে দার্জিলিং যেতে হবে । হোটেল যাওয়ার পথে যখন জিপে ছিলাম মনে হচ্ছিল- আহা দার্জিলিং...কত যেন চিনি দার্জিলিং কে । সুনীল, সমরেশ, অঞ্জনের দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি..দুধারে চা বাগান । পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো, একেকটা বাঁক এত তীক্ষ এখানে ! একবার ডানে হেলে পড়তে হয়, পরমুহূর্তেই আবার বামে । যাওয়ার পথেই আমরা দেখলাম কাঞ্চনজংঘা । মনে হচ্ছে শূণ্যে ভেসে আছে যেন চূড়াটা । নিচে মেঘে ঢাকা, শুধু চূড়া দেখা যায়, উপরে আবার আকাশ । উপরে উঠতে উঠতে একসময় জিপ থামল । এখান থেকে নাকি আরো উপরে হেঁটে যেতে হবে । সবই খুব ভাল ছিল, শুধু এই হেঁটে উপরে ওঠার কষ্টটা ছাড়া । আমাদের হোটেলটা নাকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০০ ফিট উপরে ছিল ! এসে ফ্রেশ হয়ে সবাই দৌড়ে শপিং এ বের হল । কেনাকাটা শেষে হোটেলে ফিরতে গিয়ে একসাথে সবাই পথ হারিয়ে ফেললাম । অনেক ঘুরপাক খেয়ে হোটেলে ফিরে ডিনার । হোটেলের ডাইনিং হল ছিল আরো উপরে । সিড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতেই সবাই কাহিল ! রাতে আবার জলসা । গান-নাচ আর ভূতের গল্প । সেই ঠান্ডা রাতে লেপের নিচে কাঁপতে কাঁপতে ভূতের গল্প শুনতে আমার মত ভিতুর ডিমেরও ভাল লাগছিল । সারা রাত জেগে ৫টায় আবার সানরাইজ দেখতে টাইগার হিল এর দিকে রওয়ানা দিলাম ।
পুরা ট্যুরে আমরা যেই শীতের কবলে পড়িনি এক টাইগার হিলই তা উশুল করে দিল । প্রচন্ড ঠান্ডা, তার সাথে গায়ে কাঁটা দেওয়া বাতাস ! শীতে কাঁপতে কাঁপতে কাঞ্চনজংঘায় সূর্য ওঠা দেখলাম । সারেংকোটে যদিও সূর্যোদয় দেখে এসেছি, তবু টাইগার হিলে অন্যরকম এক অনুভূতি হল যেন । উপর থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি হঠাৎ পৃথিবীর মাঝখান থেকে যেন সূর্য হাজির ! তাও গোলাপি রঙ নিয়ে ! সারেংকোটে সূর্যোদয়ের সাথে পাহাড়ের রঙ পাল্টাতে দেখেছি, আর টাইগার হিলে পাল্টে গেল আকাশ । অসাধারণ দৃশ্য ...
ব্রেকফাস্টের জন্য হোটেলে ফেরার পথে দেখে এলাম নির্জন ঘুম মনেস্ট্রি । এখানকার সিংগারার কথা না বললেই নয় । ভীষন সুস্বাদু । সবাই টপাটপ শুধু গিলেছি ! এরপর গেলাম বাতাসিয়া লুপ । এটা একটা ওয়ার মেমোরিয়াল । পার্কের মত করে সাজানো আর কাঞ্চনজংঘার অপূর্ব ভিউ । এখানকার উল্লেখযোগ্য জিনিস হল – সকালের শিশিরগুলো ঘাসের উপর পরে সব সাদা বরফ হয়ে ছিল । এরপর হোটেলে ফিরে ব্রেকফাস্টের পর গঙ্গামায়া ।
গঙ্গামায়ার কথা একটু বিস্তারিত লেখার লোভ সামলাতে পারছিনা। পাথর, ঝরনা, লেক আর সবুজে ছেয়ে আছে গঙ্গামায়া । স্বচ্ছ পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা জাতের রঙ্গিন মাছ । একদিকে দেখলাম নাচের যজ্ঞশালা । আগতদের আনন্দ দেয়ার জন্য একের পর এক স্থানীয় নৃত্য চলছে । গঙ্গামায়াতে এসে সবচেয়ে মজার যে ঘটনা তা হল স্থানীয় পোশাক পরে আমাদের ফটোসেশন, যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা, ফারহান স্যারের রাজা সাজা, আজমের “জিঙ্গালা” গানের সাথে ফারহান স্যার-রুমানা ম্যাডাম সহ আমাদের সবার নাচ- খুব এনজয় করেছি আমরা । গঙ্গামায়ায় ঘোরাঘুরির পাট চুকিয়ে গেলাম রক গার্ডেন । একটু আগে ঝরনা দেখে এসে অনেকে যদিও প্রথমে এখানে ঢুকতে চাইছিলনা, ২/১ জন ঢুকতেই সবাই আবার হুড়মুড় করে ঢুকে গেল । বেশ বড় আর উঁচু একটা পাহাড়ী ঝরনাকে কেন্দ্র করে পুরো রক গার্ডেন সাজানো । এখানে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার হোটেলে রওয়ানা দিলাম আমরা । হোটেলে ফিরে লাঞ্চ ।
এইদিনটি ছিল আক্ষরিক অর্থে আমাদের ট্যুরের শেষ দিন । হোটেলে ফিরতেই বিদায় ঘন্টা যেন আরো বেশি বাজতে লাগল । আসার আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম কোন হল এ গিয়ে মুভি দেখব সবাই । সেদিন সন্ধ্যায় গেলাম মুভি দেখতে । ফিরতে ফিরতে প্রায় ১০টা । এসে ফাইনাল গোছগাছ শুরু করল সবাই । যদিও সে রাতে আমাদের ফাইনাল জলসা বসার ছিল, কিন্তু ক্লান্তিতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে জলসা বাতিল হয়ে যায় ।
দেশের পথেঃ পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর আবার জিপে ঘন্টা তিনেক জার্নি শেষে শিলিগুড়ি । ফেরার পথে সবারই কম বেশি মন খারাপ ছিল । সবার মনেই ট্যুর শেষ হয়ে যাবার আক্ষেপ । শিলিগুড়িতে এক ঘন্টার বিরতি দেয়া হয়েছিল । এই এক ঘন্টায় সবাই শেষ কেনাকাটা করতে ছুটলাম “বিধান মার্কেট” । ফিরে লাঞ্চ সেরে বাসে । ৪টার দিকে পৌঁছে গেলাম চ্যাংড়াবান্ধা । এখানে এসে মোবাইল নেটওয়ার্ক চলে আসায় সবাই হুটোপুটি করে বাসায় খবর দিতে শুরু করল । ফেরার পথে বর্ডারে বি,ডি,আর যা একটু সমস্যা করেছিল আমাদের শপিং নিয়ে । বর্ডার পার হয়ে চলে আসার সময় আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে দেশে চলে এসেছি, দুঃখ লাগছিল হারানো দিনগুলোর জন্য । এই সময় সবাই যেমন ভাবে তেমন আমরাও ভাবছিলাম “আবার আসব, আবার ..., দলবেঁধেই ...”
বুড়িমারী এসে বাসে যার যার লাগেজ তুলে দিয়ে খেতে গেলাম আবার বুড়ির হোটেলে । অনেক দিন পরে গরুর মাংস – পরোটা পেয়ে সবাই হামলে পরলাম প্লেটে । রাজকীয় ডিনার শেষে ফিরতি বাসে উঠলাম আবার । এবার গন্তব্য ঢাকা । এতদিন আমাদের বাস জার্নি মানেই ছিল হইচই আর আন্তাকসারি । এই শেষ বাস জার্নিতে সবাই চুপ । হয়তো ক্লান্তি, হয়তো ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সবাইকে । আমার মত সবাই হয়তো ভাবছিল “ আবার.....আবার...”...
অবশেষে সূর্য ওঠার একটু আগেই পৌঁছে গেলাম কমলাপুরে শ্যামলী কাউন্টারে । ট্যুর শেষ । তখন থেকেই মনটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে । আজ এখনো ঘরে বসে আছি, কিন্তু সবার মন পরে আছে সেই ১০ দিনে । হায়, যারা যায়নি তারা বুঝবেও না কি হারালো....আর যারা গিয়েছি তাদের স্মৃতিতে সারাজীবন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ট্যুরটা।
[বি.দ্র. লেখাটা ডিপার্টমেন্টের ম্যাগাজিনের জন্য লিখেছিলাম। ]
Thursday, January 24, 2008
উত্তরের হাওয়া
নেপাল থেকে ফিরে খুব ভাব নিয়েছি কয়দিন। কোন শীতের কাপড় পরিনা। সবাই ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে, আর আমার রুমে দিব্যি ফ্যান চলে। আজকের ঘটনা ভিন্ন। জামার উপর সোয়েটার, তার উপর চাদর। সকাল থেকেই হঠাৎ করে উত্তুরে হিমেল হাওয়া বইছে আজ। বেলা বাড়তেই শুরু হল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বাসায় ফেরার পথে রিক্সা নিলাম, ভাগ্যিস রিক্সার পলিথিনটা ছিল। কারণ, অনেককেই দেখলাম পলিথিন না থাকায় রিক্সার হুড তুলে তিন নাম্বার সিটে বসে পা তুলে রেখেছে বসার সিটে। ঠান্ডায় জুবুথুবু হয়ে বসে থাকা মানুষগুলোকে দেখতে যদিও খুব হাস্যকর লাগছিল, আবার মায়াও লাগছিল। ফেরার পথে ভাবছিলাম কোন পুণ্যের বদলে আজকে যদি বাসায় গিয়ে দেখি গরুর গোশত না হলেও ইলিশ মাছ ভাজি দিয়ে খিচুড়ি - আহ, বেশ জমত তাহলে। বাসায় এসে দুঃখের সাথে টের পেলাম- নাহ, খাতায় এখন পর্যন্ত কোন পুণ্য তো জমেইনি, বরং খিচুড়ি-গোশতের কথা ভাবতে ভাবতে শাক-মাছ দিয়ে ভাত খাওয়াই আমার ভবিতব্য। একটু ঠান্ডা বা বৃষ্টি হলেই তা উপভোগ করার নানা চিন্তায় ব্যস্ত হতে বেশ লাগে আমার। বর্ষায় বৃষ্টি মোটামুটি হলেও ঢাকায় আজকাল শীত বলতে গেলে তেমন পড়েইনা। বাসায় তো ভারী সোয়েটার পরার দরকারই হয়না। অনেক শীত বলতে এখন শুধু গভীর রাতে একটু ঠান্ডার প্রকোপ- তাই লেপ, আর সকালের দিকে বাইরে যাওয়ার সময় সামান্য একটু কাঁপাকাঁপি- তাই চাদর। সারাদিন আর তেমন ঠান্ডা কোথায়? ছোটবেলায় শীত বুঝতাম নানু-দাদূর বাড়ি গেলে। আজকাল যাওয়াও হয়না, তাই বোঝা ও হয়না। আজ অনেকদিন পরে ঢাকায় শীত পড়ল। অনেকের অনেক কষ্ট হচ্ছে জানি, তবু আমাদের যাদের ঠান্ডায় কোন সমস্যা নেই তারা লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে আজকের দিনটা ভালই কাটাব। বিছানায় বসে, লেপের নিচে, এক হাতে গল্পের বই, আরেক হাতে চায়ের কাপ- ভাবতেই ভাল লাগছে!
Monday, January 21, 2008
আনন্দ নগর
আজকাল দিনগুলো ভালই কাটছে। ভাই এসেছে বিদেশ থেকে বৌ-বাচ্চা নিয়ে। ছেলেটা একদমই ছোট, শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে হাসে; আর ভাইজিটা আধো আধো বুলিতে ইংরেজী বলে। শুনতে ভালই লাগে। বাসায় কেউ আসলে ওকে ডেকে নিয়ে সামান্য একটু গর্ব ভরে বলি “ মা, একটা ছড়া বল তো!” ও যদি মাথা নেড়ে বলে “ no, I can't ” , তাতেও মনে হয় - হে হে, উচ্চারণ শুনেছ? পারবে এমন? ভাবখানা এমন করি যেন তারা কত না দুর্ভাগা যারা ওর rhyme শুনতে পারলনা! নাহ, যত যাই কিছু বলি না কেন ওরা আসাতে সময়টা ভাল কাটছে। ট্যুর থেকে ফেরার পর মনটা যেমন সারাদিন উদাস হয়ে থাকত, এখন তা বেশ কমে গেছে। অবশ্য ওরা যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণি। দেশে ফিরে ওদের ছাতা-মাথা এত কিসের কাজ থাকে কে জানে? সারাদিন শুধু বাইরে আর বাইরে। এরমাঝে আছে পিচ্চিগুলোর নানু বাসা। ওরা নানু বাসায় গেলে মনে হয়- ইশ দেশে এসেছে মাত্র কয়টা দিনের জন্যে, তাও এখানে বেশী সময় থাকতে পারছেনা। স্বার্থপরের মত ভাবি নানুবাসায় এত যাওয়ার দরকার কি? আমাদের বাসাটা সাধারনত একদম চুপচাপ। মাঝে মাঝে ছোট দুই বোনের ঝগড়ার আওয়াজে তাও ঘরে মনুষ্য বসবাসের আলামত টের পাওয়া যায়। আমার মা সাধারণত প্রবল দুঃখে থাকেন কেন আমরা যে যার মত শুধু নিজেকে নিয়েই থাকি? এই ঘরে নাকি তিনি কথা বলার মানুষ পান না। ভাইবোনদের অর্ধেকই এখন দেশের বাইরে থাকে। ঘরটা তাই ফাঁকাই থাকে বলতে গেলে। মাঝে মাঝে ওরা আসলে ঘরটা সরগরম হয়ে ওঠে কিছুদিনের জন্য। মায়ের অভিযোগ থেকে বাঁচি কয়টা দিন। ওরা চলে গেলে কয়দিন ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আবার দিনগুলো যে-ই সে-ই হয়ে ওঠে। আবার সেই একই অভিযোগ। অন্যবার কেউ দেশে এলেই দেখা যায় আমাদের কারো না কারো কোন না কোন পরীক্ষা লেগেই থাকে। সে দিক দিয়ে এবার বেঁচে গেছি। সব্বাই ফ্রি। এদিকে আবার ছোট ভাইয়ার বিয়ে। মেয়ে খুঁজছি। মাস দু’এক ভালই আনন্দে কাটবে মনে হচ্ছে।
Sunday, January 20, 2008
একলা লাগে
অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আমাদের ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরটা সেরে আসলাম। ২ তারিখে গিয়ে ফিরে এলাম ১২ তারিখে। ট্যুরের রেশ কাটাতে কাটাতেই এতদিন। ১০ দিনের ট্যুরকে আমরা ১৭ দিনে নিয়ে এসেছি স্মৃতি রোমন্থন করে করে। আজ যখন নিজের ঘরে একলা বসে আছি, তখন মনে পড়ে যাচ্ছে এই তো কয়দিন আগে সারাটা দিন বন্ধুদের সাথে কাটিয়েছি। এক মূহুর্ত অবসর ছিলনা চুপচাপ বসে থাকার। হৈ-হুল্লোড় আর চিৎকারেই কেটে যেত সারাদিন। কোথায় কোথায় বেড়িয়েছি তা বড় কথা নয়, সবাই মিলে একসাথে আনন্দ করেছি- এই ছিল বড় পাওয়া। চার বছর এক সাথে পড়ে ওদেরকে যত না চিনেছি, এই দশদিনে তার চেয়ে বেশী চিনেছি যেন। সবাই মিলে আন্তাকশারি খেলা, ক্যাম্প ফায়ারিং, ধুন্ধুমার নাচ - কোন ফাঁকে দিন কেটে গেছে টেরও পাইনি। ক্লাশে যার মুখ দিয়ে টু শব্দ পর্যন্ত বের হয়না, ট্যুরে গিয়ে তারি দাপাদাপি দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে। সব বন্ধুর চোখ একসাথে মুগ্ধ হয়েছে আকাশের সৌন্দর্য দেখে, একসাথে মৌন হয়েছে সবাই পাহাড়ের বিশালতায়। ২২ টা প্রাণের স্পন্দন এক হয়েছিল এতদিন।
আজ বড্ড একা একা লাগছে।
আজ বড্ড একা একা লাগছে।
Subscribe to:
Posts (Atom)